
“ইসলামের পথে জীবন গড়ি” মানে হচ্ছে, ইসলামের আদর্শে জীবন গঠন করে পৃথিবী এবং আখিরাতের সফলতা অর্জন করা। এছাড়া, ইসলাম শান্তি, ন্যায়, ঐক্য এবং মানবতার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা শেখায়। নীতি ও আদর্শ অনুযায়ী পরিচালনা করতে উৎসাহিত করে। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা প্রদান করে, যা ব্যক্তিগত ও সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল দিক নিয়ে দিকনির্দেশনা দেয়। এক কথায় ইসলামের মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস এবং তার আদেশ-নিষেধগুলো হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর তরীকা অনুযায়ী মেনে চলা।
রাসুলকে পাঠানোর উদ্দেশ্য সম্পর্কিত কোরআনের আয়াত সমূহ:
“নিশ্চয়ই আমি আপনাকে সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছি, পাঠিয়েছি আযাবের ভীতি প্রদর্শনকারী ও জান্নাতের সুসংবাদবাহী হিসাবে। জেনে রাখুন আপনাকে জাহান্নামের অধিবাসী দের ব্যাপারে কোনো রকম প্রশ্ন করা হবে না ।” (আল-বাকারা, আয়াত-১১৯
“হে চাদরাবৃত! উঠুন এবং মানুষদের পরকালের শাস্তি সম্পকে সাবধান করুন, আপনার প্রভুর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষনা করুন!” (আল-মুদ্দাসসির, আয়াত ১-৩ )
“আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি” (আম্বিয়া -১০৭)
দ্বীনের দাওয়াতের গুরুত্ব ও ফযীলত:
দ্বীনের দাওয়াত, বা ইসলামের দাওয়াত, মানুষের কাছে ইসলামকে পরিপূর্ণভাবে পৌঁছানোর জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এটি মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি উত্তম ও পবিত্র দায়িত্ব, যা প্রতিটি মুসলমানের ওপর রয়েছে। দ্বীনের দাওয়াতের গুরুত্ব ও তৎপর্য অনেক দিক থেকে স্পষ্ট, এবং এটি ইসলামের মূলনীতি ও বৈশিষ্ট্যগুলোকে প্রতিফলিত করে।
“এবং আল্লাহ তায়ালা শান্তির ঘর অর্থাৎ জান্নাতের দিকে দাওয়াত দেন এবং তিনি যাহাকে ইচ্ছা সরল পথ দেখান” (ইউনুস-২৫)
“হে ঈমানদার ব্যক্তিরা, তোমরা ঈমান আনো আল্লাহর ওপর, তার রাসূলের ওপর, সে কিতাবের ওপর যা আল্লাহ পাক তার রাসুলের উপর অবর্তীর্ণ করেছেন “…. (আন-নিসা -১৩৬)
“হে মু’মিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর যেমনভাবে তাঁকে ভয় করা উচিত, তোমরা প্রকৃত আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। ” (আল-ইমরান – ১০২)
“সময়ের কসম, মানুষ নিশ্চয়ই ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত আছে, সে লোকগুলি ব্যতিত, যারা আল্লাহ পাকের উপর ঈমান এনেছে, নেক কাজ করেছে, একে অপরকে নেক কাজের তাগিদ দিয়েছে এবং একে অপরকে ধৈর্য্য ধারন করার উপদেশ দিয়েছে ।” (আল -আছর ১-৩ )
হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা) বলেন, রাসূল (সঃ) বলেছেন, যখন তোমাদেরকে দুনিয়ার মহববত পেয়ে বসবে তখন যারা কুরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক কথা বলবে বা আমল করবে তারা প্রথম যুগের মুহাজির ও আনসারগনের সমান মর্যাদা পাবে I মেশকাত, তিরমিযি, মুসনাদে আহমদ।
দ্বীনের দাওয়াত বা ইসলামের দাওয়াতের কাজ ইসলামের একটি অত্যন্ত সম্মানিত এবং ফযীলতপূর্ণ কাজ। আল্লাহ তাআলা কুরআন এবং হাদীসের মাধ্যমে মুসলমানদের দ্বীনের দাওয়াতের গুরুত্ব ও ফযীলত প্রকাশ করেছেন। যে ব্যক্তি দ্বীনের দাওয়াতের কাজ করে, তার জন্য রয়েছে অসংখ্য আধ্যাত্মিক পুরস্কার এবং আল্লাহর কাছ থেকে বিশেষ বরকত। নিচে দ্বীনের দাওয়াতের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফযীলত আলোচনা করা হলো:
১. আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন
দ্বীনের দাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব।
২. একটি সৎ কাজের জন্য সওয়াবের অনুগ্রহ
যে ব্যক্তি অন্যকে ইসলামের সঠিক পথের দিকে আহ্বান করে, তার জন্য আল্লাহ তাআলা অসীম সওয়াব দান করেন। হাদীসে এসেছে:
“যে ব্যক্তি মানুষের মাঝে একটি ভাল কাজের দিকে আহ্বান করবে, তাকে সেই কাজের সমান সওয়াব দেওয়া হবে।” (সহীহ মুসলিম)
অর্থাৎ, দাওয়াতকারী ব্যক্তি যদি অন্যদের ভালো কাজ করার দিকে উদ্বুদ্ধ করে, তবে তার নিজের সওয়াবের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং তিনি আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কৃত হন।
৩. এবাদতের মাধ্যমে এক নতুন জীবন পায়
দ্বীনের দাওয়াতের মাধ্যমে যে ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করে বা ইসলামের সঠিক পথ অনুসরণ শুরু করে, তার জন্য তা পরকালে কল্যাণকর হবে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি একজন মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে, তাকে তার অনুসারী ব্যক্তির প্রতিটি ভাল কাজের জন্য সওয়াব দেওয়া হবে, এমনকি তার কর্মের সওয়াবও সেদিন পাওয়া যাবে।” (সহীহ মুসলিম)
এতে প্রমাণিত হয় যে, দাওয়াতের মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণকারী ব্যক্তি যত নেক আমল করবে, তত সওয়াব দাওয়াতকারীর নামেও আসবে।
৪. মুসলমানদের মধ্যে ভালোবাসা ও ঐক্য বৃদ্ধি পায়
দ্বীনের দাওয়াত মুসলমানদের মধ্যে একে অপরের প্রতি ভালোবাসা ও সহযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি করে। যখন কেউ ইসলামের দাওয়াত দেয়, তখন মানুষ আল্লাহর পথে ফিরে আসে এবং মুসলমানদের মধ্যে সম্পর্ক দৃঢ় হয়। এটি সমাজে শান্তি ও ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে।
৫. বিশ্বস্ততা এবং কল্যাণের পথে পথপ্রদর্শক
দ্বীনের দাওয়াত দানকারী ব্যক্তি আল্লাহর পথে পথপ্রদর্শক হয়ে উঠে, এবং সে অন্যদের কল্যাণের পথে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। দাওয়াতের মাধ্যমে, সে সমাজে নৈতিক অবস্থা পরিবর্তন ঘটাতে এবং মানুষকে আল্লাহর পথে চলতে উৎসাহিত করতে সক্ষম হয়।
৬. দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা
দ্বীনের দাওয়াত কেবল আধ্যাত্মিক নয়, এটি দুনিয়া ও আখিরাতেও সফলতা আনে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি দাওয়াত দেয় এবং মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করে, তার জন্য রয়েছে আল্লাহর কাছ থেকে অপরিসীম পুরস্কার।” (সহীহ মুসলিম)
অর্থাৎ, দ্বীনের দাওয়াতের মাধ্যমে দুনিয়াতে একজন মুসলিম ভালো কাজ করে এবং পরকালে মহান পুরস্কারের অধিকারী হয়।
৭. দাওয়াতকারীকে গুনাহ থেকে রক্ষা
যে ব্যক্তি দ্বীনের দাওয়াতের কাজ করে, সে নিজের গুনাহ থেকে রক্ষা পায় এবং তার জীবনে বিপদ আপদ কমে আসে। আল্লাহ তাআলা দাওয়াতকারীকে বিশেষ আশীর্বাদ প্রদান করেন এবং তার জীবনকে সাফল্যমণ্ডিত করেন।
৮. শহীদদের সমকক্ষ মর্যাদা
কিছু হাদীসে এসেছে যে, দ্বীনের দাওয়াতকারী ব্যক্তি যদি মৃত্যু বরণ করে, তবে তাকে শহীদের মর্যাদা দেওয়া হয়। এমনকি ইসলামের পথে কাজ করার সময় কেউ মৃত্যুবরণ করলে, তাকে শহীদের মর্যাদা দেওয়া হয়।
৯. আল্লাহর পথে এক বড় দায়িত্ব পালন
দ্বীনের দাওয়াতের কাজ কেবল একজন মুসলমানের দায়িত্ব নয়, এটি একটি বড় এবং পবিত্র দায়িত্ব, যা আল্লাহর প্রতি আনুগত্য এবং মানুষকে আল্লাহর পথ দেখানোর উদ্দেশ্য পূর্ণ করে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি মানুষের জন্য উপকারী কোনো কিছু শিখে, এবং তা অন্যদের কাছে পৌঁছে দেয়, সে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত।” (তিরমিজি)
১০. এবাদত ও দাওয়াতের সঠিক সমন্বয়
দ্বীনের দাওয়াত ঈমান ও আমলের মধ্যে সঠিক সমন্বয় ঘটায়। দাওয়াতকারী ব্যক্তি ঈমানের শক্তিতে প্রবৃদ্ধি লাভ করে এবং তার আমল সঠিক ও সুশৃঙ্খল হয়ে ওঠে।
দ্বীনের দাওয়াতের কাজ একটি সম্মানিত এবং ফযীলতপূর্ণ কাজ, যার মাধ্যমে একজন মুসলমান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে এবং অন্যদেরও ইসলামের সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে। এটি একজন মুসলমানের নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং তার মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা অর্জন সম্ভব।
উম্মতে মুহাম্মদী কে দুনিয়াতে প্রেরনের উদ্দেশ্য ,দায়িত্ব ও কর্তব্য:
“তোমরাই সর্বোত্তম উম্মত, সমস্ত মানব জাতির কল্যানের জন্যেই তোমাদের বের করে আনা হয়েছে, তোমাদের দায়িত্ব হচ্ছে তোমরা দুনিয়ার মানুষদের সৎ কাজের আদেশ দিবে এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবে, আর তোমরা নিজেরাও আল্লাহর ওপর পুরাপুরি ঈমান আনবে।” আল-ইমরান-১১০
“তোমাদের মধ্যে হতে একটি জামাত এমন হওয়া জরুরী যারা মানুষদের কল্যানের দিকে ডাকবে, সৎ কাজের আদেশ দিবে, অসৎ কাজ থেকে তাদের বিরত রাখবে, সত্যিকার অর্থে এরাই হচ্ছে সফলকাম জামাত ।” আল-ইমরান- ১০৪
“ঐ ব্যক্তির কথার চেয়ে ভাল কথা আর কাহার হইতে পারে, যে মানুষদের আল্লাহ পাকের দিকে ডাকে এবং সে নিজেও নেক আমল করে এবং বলে যে, নিশ্চয় আমি মুসলমানদের মধ্য হইতে একজন ।” হা-মীম আস-সাজদাহ ৩৩
“হে নবী আপনি বলে দিন , এটাই আমার পথ। আল্লাহর দিকে জেনে বুঝে দাওয়াত দেই আমি এবং আমার অনুসারীরা। আল্লাহ পবিত্র। আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।” ইউসুফ ১০৮
” মুমীন পুরুষ ও মুমীন নারীরা হচ্ছে একে অন্যের বন্ধু I এরা মানুষদের ন্যায় কাজের আদেশ দেয়, অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে, তারা নামায প্রতিষ্ঠা করে -.”.. তওবা -৭১
মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইরশাদ করেন-” আমি মুবাল্লিগ অর্থাৎ আল্লাহর পয়গাম মানুষের কাছে পৌছানো ওয়ালা । আল্লাহ তায়ালা হেদায়াত দেন I আমি বন্টনকারী আর আল্লাহ তায়ালা দান করেন I”( ইমাম বুখারী)
কিয়ামতের দিন উম্মতে মুহাম্মদীর মুবাল্লিগ গনের সম্মান ও মর্যাদা:
আনাস ইবনে মালেক (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সঃ) ইরশাদ করেন, আমি কি তোমাদেরকে এমন কওমের কথা বলব না যারা নবীও নয় শহীদ ও নয় অথচ নবীগণ ও শহীদগণ কিয়ামতের দিন তাদের অবস্থান দেখে ঈর্ষা করতে থাকবেন। তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে নুরের মিম্বরে উপবিষ্ট থাকবেন । সাহাবায়ে কেরাম (রাজি) আরজ করলেন -হে আল্লাহর রাসূল! ঐ সমস্ত লোক কারা? হুজুর (সঃ) ইরশাদ করেন-যারা আল্লাহর বান্দাদেরকে আল্লাহর বন্ধু বানিয়ে দেয় এবং আল্লাহকে তার বান্দাদের বন্ধু বানিয়ে দেয় এবং জমিনের উপর সৎ কাজে আদেশ করে চলে। আনাস (রা) বলেন, আমরা আরজ করলাম, আল্লাহ পাককে তার বান্দাদের বন্ধু বানিয়ে দেওয়া এ কথাতো ঠিক আছে কিন্তু আল্লাহর বান্দাদেরকে আল্লাহর বন্ধু বানাবে কিভাবে? হুজুর(সঃ) ইরশাদ করেন- লোকদেরকে ঐ সমস্ত কাজের আদেশ করে যা আল্লাহ পছন্দ করেন এবং ঐ সমস্ত কাজ থেকে নিষেধ করে যা আল্লাহ অপছন্দ করেন। যখন লোকেরা তার কথা অনুযায়ী চলে তখন আল্লাহ তাদেরকে বন্ধু বানিয়ে নেন। (মেশকাত, তিরমিযি, মুসনাদে আহমদ।)
কোরআন শরীফের আয়াত সমূহের বাংলায় অনুবাদ:
ঈমান
” নিঃসন্দেহে আল্লাহ পাক সব কিছু শুনেন এবং সব কিছু জানেন ” ( আল-আনফাল-১৭
“ আল্লাহ পাক ঈমানদারদের সাথেই রয়েছেন ” ( আল-আনফাল- ১৯ )